প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ওয়াশিংটন/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল, ঠিক তখনই বিস্ফোরক এক মন্তব্য করে আলোচনায় এলেন মার্কিন এক শীর্ষ কর্মকর্তা। হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জ্যারড অ্যাজেন সরাসরি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হলো ইরানের বিশাল তেল মজুদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
জ্যারড অ্যাজেন এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, "যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের বিশাল তেলের মজুদ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া।" এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে এই পুরনো বিতর্ককে আবার উসকে দিয়েছে যে—মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য আসলে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।
গত কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তেহরানও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুসহ বাগদাদে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। বর্তমানে এই সংঘাত লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাক ছাড়িয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গোলান মালভূমিতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইরানের তেলের ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ১৯৫১ সালে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি জাতীয়করণ করেন, তখন থেকেই সংকটের শুরু। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সহায়তায় এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়—যাকে ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘তেল ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখা হয়।
একই সময়ে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) রাজনীতিতেও স্বাধিকারের লড়াই দানা বাঁধছিল। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—বাংলাদেশ সবসময়ই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ২০২৫ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মার্কিন উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন ১৯৫০-এর দশকের সেই পুরনো সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই আধুনিক সংস্করণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যে গণবিপ্লব ঘটেছে, তার মূল সুর ছিল স্বৈরাচার ও বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। ঠিক একইভাবে ইরানও এখন তাদের সার্বভৌমত্ব ও খনিজ সম্পদ রক্ষায় মরিয়া।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। চলমান উত্তেজনার কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেশ কিছু ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিমা কোম্পানিগুলো কভারেজ প্রত্যাহার করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে বড় একটি অংশ শিশু। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে এখন চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এটি এখন খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক নগ্ন খেলায় রূপ নিয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তত বাড়বে—যার চড়া মূল্য দিতে হবে পুরো বিশ্বকে।
সূত্র: ১. সিএনএন ও আল-জাজিরা ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক (মার্চ ২০২৬)।
২. হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিল প্রেস ব্রিফিং।
৩. জাতীয় আর্কাইভস: মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের তেলের রাজনীতির ইতিহাস (১৯৫০-২০২৪)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |